ফাঁসি কীভাবে কার্যকর করা হয়?

কোন হত্যা মামলার আসামি বা আসামিগণ সাক্ষ্য প্রমানে সন্দেহাতীত ভাবে দোষী প্রমাণিত হয়ে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে। জেলা ও দয়রা জজ বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারে আসামীর মৃত্যুদন্ড দিলে উক্ত মামলার কাগজপত্র (ডেথ রেফারেন্স ) তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ বাহক মারফত পুলিশ প্রহরায় সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পাঠায়। এটাই বিধান।মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা করলে রায়ের কফিও আসামীকে দিতে হয়। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামী নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আপীল করতে পারে।হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে মৃত্যুদন্ড বহাল থাকলে সুপ্রীম কোর্টে আপীলের বিধান আছে।সুপ্রীম কোর্টেও মৃত্যুদন্ড বহাল রাখলে দন্ডপ্রাপ্ত আসামী দেশের প্রেসিডেন্টের নিকট প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে আবেদন করতে পারবে।প্রাণভিক্ষার আবেদন দেশের প্রেসিডেন্ট কতৃক নাকচ করা হলে শুরু হয় মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পদক্ষেপ।


ফাঁসী দুরকম ভাবে হয় । একটা ঝুলিয়ে দেওয়া । আরেকটা হল কিছুটা উঁচু জায়গা থেকে ছেড়ে দিয়ে হ্যাঁচকা টানে গলার হাড় ভেঙ্গে ফেলা ।

বাংলাদেশে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ব্যবস্থা আছে।কর্তৃপক্ষের আদেশ পাওয়র পর কারা কর্তৃপক্ষকে ২১ হতে ২৯ দিনের মধ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসির নির্দিষ্ট দিন ও সময় নির্ধারণ করে।তবে রমজান মাস, ঈদের দিন, পূজা-পার্বণের দিনে ফাঁসি দেওয়ার বিধান নেই।কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি দেওয়ার সময় জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট, সিভিল সার্জন ও পুলিশ সুপারকে বা নিজে কিংবা তাদের প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকবার জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেয়।মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীকে ফাঁসির দিন পর্যন্ত একজন মেডিকেল অফিসার সকাল-বিকাল স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে থাকেনেআসামীর কোনো জিনিস খাবার ইচ্ছে থাকলে মেডিকেল অফিসার কৈশলে তা জেনে নেন।তারপর আসামীর ইচ্ছা পূরণ করা হয়।কারো সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও কথা বলার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে তাও পূরণের ব্যবস্থা করা হয়।

অতঃপর ফাঁসির দিন ঘনিয়ে আসার আগে মঞ্চের চারদিকে পর্যাপ্ত পরিমাণ বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা করা হয়। ফাঁসির মঞ্চ সেট করা হয়। চটের বস্তার ভিতর ভারী কিছু ভরে ট্রায়াল ফাঁসি দেওয়া হয়। ট্রায়াল সঠিক হলে আসল ফাঁসি দানের পালা। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীকে এর কিছুই জানানো হয় না।তবে ফাঁসি কার্যকর করার আগে নিকটজনকে চিঠি দিয়ে দেখা করে যেতে বলা হয়। ফাঁসিদানের দিনক্ষণের তারিখ ঘোপন রাখা হয়।যে দড়ি দিয়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয় তাকে বলা হয় 'ম্যানিলা রোগ'। ফাঁসির জন্যই বিশেষভাবে এই দড়ি তৈরী করা হয়।ফাঁসির নির্ধারিত দিনে সন্ধ্যার পর আসামীকে জেলার ফাঁসির কথা শোনান। ইমাম সাহেবকে পাঠানো হয়। আসামী অমুসলমান হলে স্ব স্ব ধর্মের বিধান অনুসরণ করা হয়। ফাঁসি দানের কিছুক্ষ পূর্বে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসামীকে কনডেম সেল হতে বের করে আনা হয়। দু'হাত পেছনে নিয়ে হাত কড়া পড়ানো হয়। আসামীকে ফাঁসির মঞ্চে উঠানোর পর দু'পা একত্রে বেঁধে দেয়া হয়।তারপর কালো টুপি দিয়ে মুখমন্ডল ঢেকে দেওয়া হয়।এ টুপিকে বলা হয় ‘যম টুপি' ।

সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতিনিধিগণ ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে নেন। ডি আই জি প্রিজন অথবা জেল সুপারের হাতে একটি লাল রুমাল থাকে।জল্লাদ ফাঁসির চাকায় টান দিতে প্রস্তুত থাকে।এই মুহূর্তটি সেখানে উপস্থিত সকলের জন্য উত্তেজনাকর।ঘড়ির কাটাঁ নির্ধারিত স্থানে পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে ডি আই জি বা জেলা সুপার হাতের রুমাল ফেলে দেন।আর সেই সাথে সাথ জল্লাদ ফাঁসি কার্যকর করে। গলার দড়ির ফাঁস কাঁধ বরাবর রাখা হয় । অপরাধিকে উঁচু বাক্সের ওপর রাখা হয় । দড়িটা অনেকটা ছেড়ে লুস রাখা হয় । এরপর বাক্স খুলে গেলে আসামি দ্রুত নিচের দিকে পড়তে থাকে । এরপর দড়ির ফাঁসের অংশটা কাঁধ বড়াবর জোরে হ্যাচকা টানে ঘার ভেঙ্গে সাথে সাথে মারা যায়। এরফলে ইন্সটান্ট ডেথ হয় যাতে কষ্ট না লাগে। আসামী ফাঁসির মঞ্চের নিচের কূপের মধ্যে ঝুলতে থাকে। উপস্থিত ডাক্তার আসামীর মৃত্যু নিশ্চিত হলে মঞ্চের নীচ পথ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। পরীক্ষার পর মৃত দেহ উপরে উঠানো হয়। অত:পর পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। জেলখানার ভিতরে পোস্ট মর্টেম শেষে ‘ডেথ সার্টিফিকেট' দেওয়ার পর মৃতদেহ নিকটতম আত্মীয়-স্বজনের নিকট হস্তান্তর করা হয়।

বাংলাদেশে কোনো পেশাদার জল্লাদ নেই। কারাগারে দীর্ঘদিন সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা জল্লাদের দায়িত্ব পালন করেন। এজন্য তারা কিছু দিন ভালো খাবার পান এবং কয়েকমাস সাজা মওকুফ করে বাড়ি যেতে দেওয়া।







Comments